রবিবার, ১১ এপ্রিল ২০২১, ০২:৩৯ অপরাহ্ন

মোদির সফর ; বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অবিস্মরণীয়: মহিউদ্দিন মিশু

  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৪ মার্চ, ২০২১
বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত শুরু হতে যাচ্ছে ২৬মার্চ ২০২১। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে একের পর এক দক্ষিণ এশীয় শীর্ষ নেতাদের মধ্যে সবার চোখ এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি’জীর দিকে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের ১০ দিনের উৎসব অনুষ্ঠানে অংশ নিতে একের পর এক আসছেন ৫ দক্ষিণ এশীয় শীর্ষ নেতা। আসছেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ। পর্যায়ক্রমে শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে, নেপালের প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভান্ডারি, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আসবেন। আগতদের মধ্যে সবার চোখ এখন  মোদির সফরের ওপর।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে ২৬-২৭ মার্চ বাংলাদেশ সফর করবেন। তিনি মুজিববর্ষ উদযাপন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের যৌথ উদযাপন উপলক্ষে রাষ্ট্রীয়ভাবে এই সফর করবেন।
২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্কে নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে। ভারতে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পরে তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের আন্তরিক সমর্থন যুগিয়েছে। ভারত – বাংলাদেশ সরকার একে অন্যের সহযোগিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যার মাধ্যমে উভয় দেশের মানুষ দারুণভাবে উপকৃত হয়েছে ও হচ্ছে। ট্রানজিট, ট্রান্স-শিপমেন্ট এবং আঞ্চলিক সংযোগ স্থাপনের ফলে দু’দেশের বাণিজ্য ও পর্যটনে সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। দু’দেশের প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সীমান্তবর্তী ছিটমহল সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে নতুন ইতিহাস তৈরি করেন। যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অর্জন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে একটি চুক্তি সই হওয়া সত্ত্বেও প্রায় ৪০ বছর ধরে ঝুলে থাকা জটিল সীমান্ত সমস্যা ভারতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে অভূতপূর্ব বিল পাসের মাধ্যমে সমাধান হয়েছে।
তার বিনিময়ে শেখ হাসিনা সরকার সহযোগিতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
ভারতের পক্ষে মূল উদ্বেগের বিষয় ছিল পূর্বোত্তর ভারতের নিরাপত্তা। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে ভারতের প্রয়োজন ছিল বাংলাদেশের সহায়তা। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের সহায়তায় এ সমস্যা সম্পূর্ণ দূরীভূত হয়। বিদ্রোহীদের আশ্রয়স্থলগুলো ভেঙে দেওয়া হয় এবং পালিয়ে থাকা বিদ্রোহী নেতাদের ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তার কড়া পদক্ষেপের ফলে ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলগুলোতে শান্তি নেমে এসেছে। যার ফলে নরেন্দ্র মোদির সরকার তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরকে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ পেয়েছে। পূর্বোত্তর ভারতের ওই অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ কমে এসেছে, যার সুফল এখনের  পাচ্ছে ভারত।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক মূলত ঐতিহাসিক সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের ওপর ভিত্তি করে রচিত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তার মাধ্যমে ভারত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের সর্বাত্মক সাহায্য-সহযোগিতা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দৃঢ় ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, রাজনীতি ও নিরাপত্তার বিবেচনায় দুটি দেশ পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, এটাই বাস্তবতা। এ সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ, ভারতই প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে ভারত। বাংলাদেশ ও ভারত ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা এবং আত্মীয়তার অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ দুটি দেশ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ সম্পর্কের স্থপতি।
১৩ মার্চ (২০২১) পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেছেন, বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে আসছেন এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এটা আমাদের জন্য বড় আনন্দের বিষয়। কারন,জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী আর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ২৬ মার্চ ঢাকা আসবেন নরেন্দ্র মোদি। ঢাকা এসে পরের দিন ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে টুঙ্গিপাড়ায় যাবেন মোদি। এরপর সেদিনই মতুয়া সম্প্রদায়ভুক্ত হিন্দুদের পবিত্র তীর্থস্থান কাশিয়ানী উপজেলার শ্রীধাম ওড়াকান্দি গ্রামের ঠাকুর বাড়িতেও তিনি যেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ঠাকুর বাড়িতে অবস্থিত হরি চাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুরের মন্দিরে তিনি পূজা করে মন্দিরের সামনেই ঠাকুর বাড়ির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলবেন এবং পাশের আরেকটি মাঠে তিন শতাধিক নির্ধারিত মঁতুয়া নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন বলে জানা গেছে।
তাঁর এই সফর বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্বন্ধের দিগন্ত এখন অনেক প্রসারিত।
২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ২০১৫ সালে নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। তবে ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে একাধিক বৈঠকে অংশগ্রহণ করেছেন। ২০১৯ সালের অক্টোবরে দিল্লির হায়দ্রাবাদ হাউসে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। তার আগে ২০১৭ সালের ৭ এপ্রিল থেকে ১০ এপ্রিল ভারত সফর করেন শেখ হাসিনা।
২০১৯ সালের মে মাসে নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় দফার মেয়াদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মসনদে আসীন থাকবেন ২০২৪ সাল নাগাদ। মনে করা হচ্ছে, তখন তাঁর দেশ ভারত চীনকে টপকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশে পরিণত হবে, আবার এই দেশটি হবে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ।আর একারণে বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক গুরুত্ব বহন করে।
২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর বিশ্বজুড়ে মহামারির মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক হয় আমাদের প্রধানমন্ত্রীর। দুই দেশের সম্পর্ককে ঐতিহাসিক হিসেবে অভিহিত করে সেসময় শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘আগামী বছর বাংলাদেশ ৫০ বছরে পা দিতে যাচ্ছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ-ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কও ৫০ বছরে পড়ছে।’ তাঁর মতে, উভয় দেশ বিদ্যমান সহযোগিতামূলক ঐকমত্যের সুযোগ নিয়ে অর্থনীতিকে বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিকভাবে আরও সংহত করতে পারে। দুই দেশের চলমান উদ্যোগগুলো এতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে।’
কোভিড-১৯ মোকাবিলায় ভারতের স্বাস্থ্য প্যাকেজের পাশাপাশি ‘আত্মনির্ভর ভারত’ উদ্যোগের বিভিন্ন প্যাকেজের প্রশংসা করে তিনি আরো বলেন, ভারতের গৃহীত নীতিমালার মাধ্যমে দেশটি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ১৯৭১ সালে এদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্র স্মরণে বিশ্বের বিভিন্ন শহরে ২০২১ সালে বছরজুড়ে যৌথ কর্মসূচি পালনে বাংলাদেশ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘২০২১ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় আপনার উপস্থিতি আমাদের যৌথ উদযাপনের গৌরবময় স্মৃতি স্মরণীয় করে রাখবে।’
২০২০ সালের ওই বৈঠকে সে সময় দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি, সামাজিক উন্নয়ন, কৃষিসহ সাতটি বিষয়ে সহযোগিতার লক্ষ্যে সাতটি কাঠামো চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও দু’দেশের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার কথা জানিয়ে বলেছিলেন, তাঁর সরকার ‘প্রতিবেশীর অগ্রাধিকার’ নীতিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং সেই নীতির ‘এক নম্বর স্তম্ভ’ হচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করার এই নীতি দায়িত্ব নেওয়ার (২০১৪) প্রথমদিন থেকেই মোদির অগ্রাধিকারে রয়েছে।
ওই ভার্চুয়াল বৈঠকে ৫৫ বছর পর বাংলাদেশের চিলাহাটি ও ভারতের হলদিবাড়ির মধ্যে রেল করিডোরেরও সুইচ টিপে উদ্বোধন করেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ওই রেলপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া ভার্চুয়াল বৈঠকে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতের পোস্টার ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর ওপর একটি স্মারক ডাক টিকেট যৌথভাবে উদ্বোধন করেন। একইসঙ্গে বঙ্গবন্ধু-বাপু (মহাত্মা গান্ধী) ডিজিটাল এক্সিবিশনও উদ্বোধন করেন দুই দেশের এই দুই সরকার প্রধান।
এছাড়া দুই নেতার ওপর একটি ছোট্ট প্রমোও দেখানো হয়।
২০২০ সালে মহামারির মধ্যেও দুই দেশের সহযোগিতা অব্যাহত থাকার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা তখন বলেছিলেন, বছরজুড়ে রেলরুট দিয়ে বাণিজ্য, উচ্চপর্যায়ের পরিদর্শন ও সভা, সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ, কলকাতা থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতে ভারতীয় পণ্যসামগ্রীর প্রথম পরীক্ষামূলক চালান প্রেরণ এবং অবশ্যই কোভিড-১৯ বিষয়ে সহযোগিতার ন্যায় বিভিন্ন উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করেছি। তিনি বলেন, করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলা করতে ব্যাপক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন ব্যাপক বিঘ্ন ঘটা এবং ভোক্তাদের চাহিদা হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও আমাদের অর্থনীতি উর্ধমুখী প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। বেশ কিছুসংখ্যক ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশের উৎপাদন ও সেবা খাতে নিযুক্ত রয়েছেন এবং তারা নিজ দেশ ভারতে রেমিটেন্স পাঠিয়ে থাকেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক পর্যটক এবং চিকিৎসা সেবা গ্রহণকারীকে ভারত ভ্রমণ করে।
বলাবাহুল্য, ৭১’মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের আন্তরিক সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য দেশটির সরকার এবং ভারতের জনগণের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানানো আমাদের সবসময় দায়িত্ব। তবে ২০২০ ও ২০২১ সাল মহামারির জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, তবে এরমধ্যেও ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভাল সহযোগিতামূলক লেনদেন গড়ে উঠেছে। ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা আছে। নানা ক্ষেত্রে দুই দেশের অংশীদারিত্ব এগিয়ে যাচ্ছে। স্থল সীমান্ত বাণিজ্যে সমস্যা কমানো গেছে, আখাউড়া – আগরতলা রেলপথ, আশুগঞ্জ – আখাউড়া হয়ে আগরতলা সড়ক পথ, ফেনী নদীর ওপর একটি সেতু নির্নাণ, সেতুটি সরাসরি যুক্ত করেছে বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর পূর্বের রাজ্যগুলোকে।
এখন ভারতের এই রাজ্যগুলো সেতু দিয়ে সহজে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে পণ্য আনা নেয়া করতে পারবে। পাঁচ বছর আগেই ভারতের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার বা ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্টের সুবিধা কার্যকরসহ কানেক্টিভিটি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নতুন নতুন জিনিস যোগ হয়েছে। এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, দু’দেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে।
২০২০ সালের ২৫ মার্চ করোনা মোকাবেলায় চীনের আগে এদেশে এসেছে ভারতের জরুরি চিকিৎসা সহায়তা সরঞ্জাম। ৩০ হাজার সার্জিক্যাল মাস্ক এবং ১৫ হাজার হেড কভার ছিল আমাদের জন্য মূল্যবান। এই উপহার ছিল করোনাভাইরাস বিস্তার রোধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ। ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথমে’ নীতির অংশ হিসেবে এবং কোভিড-১৯ এর বিস্তার রোধ করার জন্য একটি সমন্বিত আঞ্চলিক উদ্যোগ নিতে ১৫ মার্চ ২০২০ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং অন্যান্য সার্ক নেতৃবৃন্দ একটি ভিডিও সম্মেলন করেন। এই অঞ্চলের প্রতি ভারতের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এটি। এই উপহারের মতো ভ্যাকসিনও উপহার পেয়েছি আমরা। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার আবিষ্কৃত কোভিশিল্ড নামের টিকা তৈরি করেছে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট। সেই কোভিশিল্ড নামের ভ্যাকসিন ২১ জানুয়ারি (২০২১) ভারতের উপহার হিসেবে ঢাকায় এসে পৌঁছায়। আগেই ভারত জানিয়েছিল, কুড়ি লাখ ডোজ টিকা বিনামূল্যে বাংলাদেশকে উপহার দেবে তারা। এই উপহার দু’দেশের একসঙ্গে সংকট মোকাবেলার অনন্য নজির।
মনে রাখতে হবে, ২০০৯ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতবিরোধী সন্ত্রাসীদের কঠোর হস্তে দমন করে সুনাম কুঁড়িয়েছেন। ২০১৫ সালে নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের আগে সীমান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য সংবিধান সংশোধনী বিল পেশ এবং ৬ মে রাজ্যসভায় তা পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। একাত্তরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যে উচ্চতায় উঠেছিল, ওই বিল পাস হওয়ায় সেই সম্পর্ক আবার সেই উচ্চতায় পৌঁছায়। রচিত হয় সহযোগিতা ও বন্ধুতার এক নতুন সংজ্ঞা।
সে সময় ছিটমহলের বাসিন্দারা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। এতদিন পর্যন্ত ছিটমহলবাসীদের কোনো রাষ্ট্র ছিল না; এখন স্থলসীমান্ত নির্দিষ্ট হলে নিজেদের পরিচয় বিকশিত হয়েছে। আর বিলটি পাস হওয়ায় ১৯৭৪ সালের বঙ্গবন্ধু-ইন্দিরা গান্ধী চুক্তি বাস্তবায়নের সকল বাধা দূর হয়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দায়িত্ব গ্রহণ করেই প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি একাধিকবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এ ব্যাপারে আশ্বাসও দেন। একই আশ্বাস দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এখন ভারতের বিশিষ্টজনরা এককথায় স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশ ভারতের সবচেয়ে পরম্পরায় পরম বন্ধু। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের সবচেয়ে বড় মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী। শেখ হাসিনার প্রচেষ্টায় দুই দেশের অনেক দিনের সমস্যাগুলো সমাধান হয়েছে এবং নরেন্দ্র মোদির সফরের মধ্য দিয়ে আরও হতে যাচ্ছে। আর এজন্যই ২৬ মার্চ (২০২১) নরেন্দ্র মোদির এদেশ সফর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
উল্লেখ, ২০১৯ সালে রাজনৈতিক ও সরকারী পর্যায়ের বেশ কিছু উচ্চ পর্যায়ের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ২০১৯ সালের ৩০ মে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ২০১৯ সালের ০৩-০৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নয়াদিল্লী সফর করেন। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনের ফাঁকে মহাত্মা গান্ধীর ১৫০ তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষ্যে একটি উচ্চ পর্যায়ের অনুষ্ঠানে দুই প্রধানমন্ত্রীর দেখা হয়েছিল। ২০১৯ সালের ২২ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী হাসিনা এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী যৌথভাবে ঐতিহাসিক গোলাপী বল টেস্ট ক্রিকেট ম্যাচের উদ্বোধন করেন। এই উচ্চ পর্যায়ের সফরগুলি দুই দেশের মধ্যকার বহুমুখী অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করার পথ উন্মুক্ত করেছে।
২০১৯ সালের মার্চে দুই প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের চারটি দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। প্রকল্পগুলো হল- (১) দ্বিতীয় ঋণচুক্তি অধীনে ৫০০টি ট্রাক, ৩০০টি দোতলা বাস এবং ২০০টি এসি বাস সরবরাহ, (২) বাংলাদেশে ন্যাশনাল নলেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, (৩) বাংলাদেশের পাঁচটি জেলায় ৩৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক এবং (৪) ১১টি পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট স্থাপন। এছাড়াও ২০১৯ সালের অক্টোবরে আরো তিনটি প্রকল্প উদ্বোধন করেন, যেগুলো হল- (i) ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনে বিবেকানন্দ ভবন উদ্বোধন, (ii) বাংলাদেশ থেকে বাল্ক এলপিজি আমদানি এবং (iii) খুলনায় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে (আইডিইবি) বাংলাদেশ-ভারত পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (বিআইপিএসডিআই) উদ্বোধন।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শংকর ২০১৯ সালের আগস্টে ঢাকা সফর করেন এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরিবেশ, বন, জলবায়ু পরিবর্তন, তথ্য ও সম্প্রচার এবং ভারী শিল্প ও জনউদ্যোগ মন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকর ২০১৯ সালের নভেম্বরে সাউথ এশিয়া কো-অপারোটিভ এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রামের পরিচালনা পর্ষদের ১৫তম সভায় যোগ দিতে ঢাকা সফর করেন এবং বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী মো. হাছান মাহমুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের মধ্যে রয়েছে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনের যৌথ পরামর্শক কমিশনের (জেসিসি) বৈঠকে অংশগ্রহণ, আগস্ট মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিতে আসাদুজ্জামান খানের সফর এবং রেলসংক্রান্ত সহযোগিতা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে রেলমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজনের ভারত সফর।
দু’দেশের মধ্যে উল্লিখিত উচ্চ পর্যায়ের সফর ও বিনিময় ছাড়াও বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থায় অংশ নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যায়েও বিভিন্ন সফর হয়েছে। দুই দেশের বহুমাত্রিক সহযোগিতার সম্পর্ক বিস্তৃত হয়েছে পর্যটন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মত চিরাচরিত ক্ষেত্র থেকে শুরু করে পরমাণু বিজ্ঞান, মহাকাশ ও তথ্য প্রযুক্তির মত আধুনিক ক্ষেত্র পর্যন্ত। ২০১৯ সালে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য ১০টি সমঝোতা স্মারক/চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে দুই দেশের মধ্যে।
নিরাপত্তা এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা:-
২০১৯ সালে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ৪০৯৬.৭ কি. মি. স্থল সীমান্তের ব্যবস্থাপনা ও সুরক্ষা বিষয়ে বিজিবির আঞ্চলিক কমান্ডার এবং বিএসএফের সীমান্ত মহাপরিদর্শকদের মধ্যে সীমান্ত সমন্বয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা:-
২০১৯ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক- ভারতীয় নৌবাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রধানদের সফর, দ্বিতীয় বার্ষিক প্রতিরক্ষা সংলাপ পরিচালনা ও প্রথমবারের মত তিনবাহিনীর কর্মীদের মতবিনিময়, নৌ ও বিমান বাহিনীর মধ্যকার পরিষেবা সংক্রান্ত আলোচনা এবং কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকসমূহ উভয় দেশের দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। বাংলাদেশের জাতীয় প্যারেডে বিজয় দিবস উদযাপনের সময় ভারতীয় সেনা ব্যান্ড প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করেছিল। প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে উভয় দেশই পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে এবং সম্প্রসারিত করেছে।
২০১৯ সালে বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কিত কর্মসূচি, মুক্তিযোদ্ধাদের বার্ষিক বিনিময়মূলক সফর এবং মুক্তিযোদ্ধা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বৃত্তি প্রদান করা হয়।
যোগাযোগ ব্যবস্থা:-
উভয় সরকারই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ১৯৬৫ সালের পূর্বের রেলসংযোগ এবং অন্যান্য যোগাযোগের লিঙ্কগুলি পুনরুদ্ধার করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মানুষে-মানুষে সংযোগ বৃদ্ধির জন্য মৈত্রী এক্সপ্রেস সপ্তাহে চারদিন থেকে সপ্তাহে পাঁচদিন এবং বন্ধন এক্সপ্রেসের সংখ্যা সপ্তাহে একদিন থেকে সপ্তাহে দুইদিন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লী সফরের সময়, উভয় সরকারই উভয় দেশের মধ্যে জনগণের যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য ঢাকা-শিলিগুড়ি-গ্যাংটক-ঢাকা এবং ঢাকা-শিলিগুড়ি-দার্জিলিং-ঢাকা বাস পরিষেবা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা-শিলিগুড়ি-গ্যাংটক-ঢাকা বাস সেবার পরীক্ষামূলক চলাচলও সম্পন্ন হয়।
এছাড়াও, অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহণ ও বাণিজ্য প্রোটোকলের দ্বিতীয় সংযোজনে দু’টি নতুন ভারত-বাংলাদেশ প্রটোকল রুট (গোমতী নদীর উপর সোনামুড়া-দাউদকান্দি এবং পদ্মা নদীর উপরে ধুলিয়া-গোদাগিরি থেকে আরিচা পর্যন্ত সম্প্রসারণ) অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক:-
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। গত এক দশকে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশে ভারতের রপ্তানি ছিল ৯.২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং একই সময়কালে বাংলাদেশ থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ১.০৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৯ সালে সীমান্ত হাট, নৌ পরিবহণ, স্থল কাস্টমস স্টেশন (এলসিএস)/ সমন্বিত চেকপোস্ট (আইসিপি) অবকাঠামো এবং ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রচারের জন্য বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য উভয় প্রধানমন্ত্রী বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নীতিগত পর্যায়ের ইনপুট সরবরাহ এবং উভয় দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে বিনিময় সহজতর করার জন্য একটি ভারত-বাংলাদেশ সিইও ফোরাম গঠনের জন্য সম্মত হন।
বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে ভারত থেকে ১১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে। বিদ্যুৎ বিষয়ক জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ/ জয়েন্ট স্টিয়ারিং কমিটির সভাও ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
উন্নয়ন অংশীদারিত্ব:-
বাংলাদেশ আজ ভারতের বৃহত্তম উন্নয়ন অংশীদার। ভারত সড়ক, রেলপথ, নৌ পরিবহণ ও বন্দরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য গত ৮ বছরে বাংলাদেশকে ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তিনটি লাইন অফ ক্রেডিট (এলওসি) দিয়েছে। এলওসিগুলি ছাড়াও ভারত সরকার আখাউড়া-আগরতলা রেলসংযোগ নির্মাণ, বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ নৌপথ খনন এবং ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইন নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত প্রকল্পের জন্য অনুদান সহায়তা প্রদান করে আসছে।
ক্ষুদ্র উন্নয়ন প্রকল্পগুলি (এসডিপি) ভারতের উন্নয়ন সহায়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারত সরকার বাংলাদেশে ছাত্রাবাস, একাডেমিক ভবন, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং অনাথাশ্রম নির্মাণসহ ৫৫টি এসডিপিতে অর্থায়ন করেছে এবং আরও ২৬টি এসডিপি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন:-
বাংলাদেশে বিভিন্ন চলমান প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং বৃত্তির মাধ্যমে ভারতের উন্নয়ন সহযোগিতা প্রচেষ্টার একটি মূল উপাদান হল মানবসম্পদ উন্নয়ন। ভারত সরকার ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের মুসৌরিতে ন্যাশনাল সেন্টার ফর গুড গভর্নেন্সে (এনসিজিজি) প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। বাংলাদেশী পুলিশ আধিকারিকদের ভারতের প্রথম সারির বিভিন্ন ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে বিভিন্ন আধুনিক পুলিশিং এবং নতুন অনুসন্ধান কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। একইভাবে, ভারত সরকার ভোপালের ন্যাশনাল জুডিশিয়াল একাডেমি এবং ভারতের বিভিন্ন স্টেট জুডিশিয়াল একাডেমিতে ২০১৭ সাল থেকে ১৫০০ বাংলাদেশী বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। বাংলাদেশ ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইটেক অংশীদার এবং প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮০০জন আইটেক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। এছাড়াও আইআইটি ও এনআইআইটিসহ ভারতের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং এম.ফিল / পিএইচডি কোর্স করার জন্য বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের প্রতিবছর আইসিসিআর (ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস) ২০০টি বৃত্তি প্রদান করে।
ঢাকার ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র (আইজিসিসি) দুই দেশের মধ্যে সাধারণ সাংস্কৃতিক সংযোগ উদযাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আইজিসিসির যোগ, কত্থক, মণিপুরী নৃত্য, হিন্দি ভাষা, হিন্দুস্তানী ধ্রুপদী সংগীত প্রশিক্ষণ এবং ভারত-বাংলাদেশের খ্যাতনামা শিল্পীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মানুষে মানুষে যোগাযোগ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
ভিসা:
ভারতীয় ভিসা আবেদন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করতে এবং ভারত ও বাংলাদেশের মানুষে মানুষে সম্পর্ক জোরদার করার জন্য ক্ষেত্রে জনগণকে শক্তিশালী করার জন্য ভারত সরকার কুমিল্লা, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সাতক্ষীরা, ঠাকুরগাঁও এবং বগুড়ায় ছয়টি নতুন ভিসা আবেদন কেন্দ্র (আইভিএসি) খোলার মাধ্যমে ২০১৯ সালে বাংলাদেশের মোট আইভিএসি সংখ্যা ১৫তে উন্নীত করেছে। ২০১৯ সালে, বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য দেওয়া ভিসার সংখ্যা ১৫ লাখ ছাড়িয়েছে। ২০১৯ সালে খুলনা এবং সিলেটে দুটি নতুন সহকারী হাই কমিশন খোলার ফলে বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য দ্রুত ভিসা প্রক্রিয়াকরণ সহজতর হয়েছে।
অথচ, নিন্দুকেরা সমালোচনায় মত্ত থাকেন যে, ‘ভারত প্রতিবেশীকে ছাড় দেয় না’- এটা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে আয়োজিত দ্বিপাক্ষিক ভিত্তিক চুক্তি অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভুমিকা রাখছে। উভয় পক্ষই লাভবান হচ্ছে সমঝোতা স্মারকে। ভারত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনার প্রচেষ্টায় দুই দেশের অনেক দিনের সমস্যাগুলো সমাধান হয়েছে এবং নরেন্দ্র মোদির সফরের মধ্য দিয়ে আরও হতে যাচ্ছে। আর এজন্যই ২৬ মার্চ (২০২১) নরেন্দ্র মোদির এদেশ সফর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
সুতুরাং ‘২০২১ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় মোদি’জীর উপস্থিতি আমাদের যৌথ উদযাপনের গৌরবময় স্মৃতি স্মরণীয় করে রাখবে।’
লেখক,সংবাদকর্মী।

নিউজটি শেয়ার করুন..

এ জাতীয় আরো খবর..

পেছনের বিজ্ঞাপন-